"মে দিবস"

আজ মহান মে দিবস। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন ও বামপন্থী আন্দোলনের উদযাপন দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম আর সংহতির দিন। শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১২৭ বৎসর পূর্বে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। তখন তাদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টাও ছিল না। নামমাত্র মজুরিতে তারা মালিকের ইচ্ছামতো কাজ করতে বাধ্য হতো। এতে প্রায় ৩ লাখ মেহনতি মানুষ অংশ নেয়। এক পর্যায়ে আন্দোলনরত ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের রুখতে মিছিলে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। দাবি আদায়ের জন্য সেদিন শ্রমিকদের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল শিকাগোর রাজপথ। আন্দোলনে অংশ নেয়ার অপরাধে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় গ্রেফতারকৃত ৬ শ্রমিক নেতাকে। কারাগারে বন্দিদশায় এক শ্রমিক নেতা আত্মহননও করেন। শ্রমিকদের এই আত্মত্যাগ ও রক্তস্নাত ঘটনার মধ্যদিয়ে দৈনিক কাজের সময় ৮ ঘণ্টা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ঐতিহাসিক বিজয় হয়। শ্রমিকদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই সেদিন মালিকরা স্বীকার করে নিয়েছিল শ্রমিকরাও মানুষ। তারা যন্ত্র নয়, তাদেরও বিশ্রাম ও বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে দিবসটিকে 'মে দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৮৯০ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করতে শুরু করে। সেই থেকে বিশ্বব্যাপী দিনটি মহান মে দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের সকল দেশেই আজ পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস। শ্রমিক দিবসের প্রেরণা থেকে বাংলাদেশ মোটেও পিছিয়ে নেই। এ দেশে নারায়ণগঞ্জে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯৩৮ সালে। তখন ব্রিটিশ শাসনামল। তারপর পাকিস্তান আমলেও মে দিবস যথাযথ উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে পালিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শাসন থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে বিপুল-উদ্দীপনা নিয়ে মে দিবস পালিত হয়। ওই বছর সদ্য স্বাধীন দেশে পয়লা মে সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো দিবসটি বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে। আজ সরকারি ছুটি। এ বছর বাংলাদেশে দিবসটির প্রতিপাদ্য হলঃ ‘ মে দিবসের মর্মবাণী শ্রমিক-মালিক ঐক্য জানি ।’
গোড়ার কথাঃ ১৮৮৬ সালের ৩ মে হে মার্কেটে আহূত ধর্মঘটী শ্রমিকদের সমাবেশে পুলিশের হামলায় ছয়জন শ্রমিক নিহত হন। ১৮৮৬ সালে আমোরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। সেদিন দৈনিক আটঘন্টার কাজের দাবীতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলীবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। এর প্রতিবাদে ৪ মে হাজার হাজার শ্রমিক বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। সেইদিনও পুলিশের গুলিবর্ষণে পাঁচজন মৃত্যুবরণ করেন। ঐ আন্দোলন গড়ে তুলবার অপরাধে কয়েকজন শ্রমিককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এইভাবে প্রাণের বিনিময়ে শ্রমিক শ্রেণী কায়েম করে দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের অধিকার। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক ঐক্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠন সমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ১লা মে জাতীয় ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারি ভাবে পালিত হয়। আমেরিকা ও কানাডাতে অবশ্য সেপ্টেম্বর মাসে শ্রম দিবস পালিত হয়। সেখানকার কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং শ্রমের নাইট এই দিন পালনের উদ্যোক্তা। হে মার্কেটের হত্যাকান্ডের পর আমেরিকার তৎকালিন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিলেন পয়লা মে তারিখে যে কোন আয়োজন হানাহানিতে পর্যবসিত হতে পারে। সে জন্য ১৮৮৭ সালেই তিনি নাইটের সমর্থিত শ্রম দিবস পালনের প্রতি ঝুকে পড়েন। তবে শ্রমকে ভিত্তি করে সভ্যতার সূচনা হলেও শ্রমিকের মর্যাদা আজও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশসমূহে শ্রমজীবীদের দুর্দশা ঘোচে নাই। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশ্বায়নের যুগে উদারীকরণ নীতিও শ্রমিক স্বার্থে আঘাত হানছে বলে বিভিন্ন মহলের জোরালো বক্তব্য রয়েছে। শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার সংরক্ষণে কী সরকারি, কী বেসরকারি কোন পক্ষই আন্তরিক নয়। মে দিবসের অনুষ্ঠানে কেবল বক্তৃতা-বিবৃতি শোনা যায়। এসব কারণেই শ্রমজীবীদের ভাগ্য আর বদল হয় না। অথচ স্বাধীনতার পর হতে বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর করে শ্রমজীবীদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়াছে।
শ্রমিক শ্রেণীর অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। শিল্প খাতে কাজের সুযোগ বাড়লেও ন্যূনতম মজুরি আইন সর্বক্ষেত্রে কার্যকর হয় নাই। মজুরি কমিশন শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির যেই সুপারিশ করেছিলো, তার বাস্তবায়ন নিয়েও বিতর্ক আছে। অনেক শিল্প-কারখানায় আইএলও নির্ধারিত শ্রমঘণ্টাও মানা হয় না। দেশে দক্ষ শ্রমিকেরও অভাব। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠে নাই। বিশ্বমন্দার প্রভাবে বাড়েছে চাকরি হারাবার আশংকা। তা ছাড়া বিশ্বের বিভিন্নদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে বহু শ্রমিক দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতি জনশক্তি রফতানিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। দেশের বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্র অর্জনের প্রধান খাত গার্মেন্টস খাত। শ্রমিক নিয়োগে নানা অনিয়ম রযেছে এইখানে। আইন অমান্য করিয়া শিশুশ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে এখনও। তৈরি পোশাক শিল্পের ৮০ ভাগই নারী, যারা সর্বাধিক শ্রমশোষণের শিকার। নারীশ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্যসহ নানা অনিয়মের শিকার। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে তারা। অথচ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বৃহত্তম খাত অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এই পর্যন্ত অনেক গার্মেন্টস শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছে। ১৮৮৬ এর পরে ১২৭ বছর পার হলেও শ্রমিকরা যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। প্রতি বছরই ভাঙা রেকর্ডের মতে একই গান বাজে, ন্যায্য মজুরী চাই, নির্দিষ্ট কর্ম ঘণ্টা চাই, অতিরিক্ত কাজের মজুরী চাই, নিরাপদ কর্মস্থল চাই। আশা হত ভাগ্য হত শ্রমিকরা শুধু চেয়েই যাচ্ছে কিন্তু প্রাপ্তি সামান্য। দেশের বেশির ভাগ শ্রমজীবী জীবনযাত্রার ন্যূনতম চাহিদা পূরণে উপযুক্ত মজুরি পান না। শ্রমিক-কর্মচারীরা যে মজুরি পান, তা অপর্যাপ্ত। বেশির ভাগই স্বামী ও স্ত্রী মিলে কাজ করে কোনোমতে টিকে থাকছেন। কেউবা ঋণের দায়ে জর্জরিত হচ্ছেন। এই শ্রেণির মানুষ জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে বড় ধরনের আপস করছেন।
গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিবিএসের জরিপ বলছে, মিস্ত্রি বা যন্ত্রী হিসেবে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের গড় বেতন ১২ হাজার টাকা। সেবা ও বিক্রয়কর্মীরা সাড়ে ১১ হাজার এবং কৃষি ও মৎস্যের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা ৮ হাজার ৯০০ টাকা বেতন পান। এ ছাড়া দারোয়ান, নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও কুলি গড়ে ৮ হাজার ২০০ টাকা বেতন পান। আর অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত রিকশাচালক, গৃহকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, নাপিত, ফেরিওয়ালা, ফুটপাতের হকারসহ অন্যদের আয় বা মজুরি আরও কম। গৃহকর্মীর দৈনিক গড় আয় সবচেয়ে কম। সরকারি জরিপ বলছে, একজন গৃহকর্মীর দৈনিক আয় গড়ে ৯০ টাকা। দেশে প্রায় ২০ লাখ গৃহশ্রমিক কাজ করছেন, যাঁদের মধ্যে অনেকে আবার বেতন পান না। তাছাড়া অন্ন বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা চিকিৎসা মোট কথা জীবন যাত্রার মান বিশ্লেষণ করলে তারা দারুণ অবহেলিত বঞ্চিত । তাদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। তাছাড়া পোষাক খাতের প্রধান হুমকি বিশ্বমন্দা। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতিও কম বড় সমস্যা নয়। গোটা বস্ত্র খাতই এই পরিস্থিতির শিকার যা শ্রমিকদের জন্যও হুমকি। শোষণ প্রতিরোধে, ন্যায্য দাবি আদায়ের অন্যতম পথই হলো শ্রমিকের ঐক্য ও সংগ্রাম। নির্দিষ্ট শ্রমঘণ্টার সাথে, জীবনের নিরাপত্তা, ন্যূনতম মজুরি, বেতন বৈষম্য দূরীকরণ, নিয়োগপত্র প্রদানের ন্যায় বিষয়ও আজ শ্রমিকদের জোরালো দাবিতে পরিণত হয়েছে। ‘সবার জন্য প্রযোজ্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি এবং নিরাপদে কাজের অধিকার’। বিশ্বব্যাপী ট্রেড ইউনিয়নসমূহও তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। মহান মে দিবসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব মহলের উচিত, এসব দিকে নজর দিয়ে মেহনতি মানুষের অধিকার সমুন্নত রাখা। সে জন্য শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। মহান মে দিবস সেই প্রেরণার অফুরান উৎস। শ্রমিকদের বিধিসম্মত সব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা ও শ্রমিকদের সব অধিকার নিশ্চিত করা হলেই শ্রমিক দিবস সফল হবে।

আসাদ শাহীন
E-mail:shah33n@chef.net

Post a Comment

[blogger]

MKRdezign

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget