যে মানুষটা বদলে দিতে চেয়েছিলেন ঢাকা শহরকে! ---- মুহাম্মদ সাইদুজ্জামান আহাদ

 

মানুষটাকে আমি প্রথম দেখি টেলিভিশনে। তখনও স্কুলের গণ্ডি পার হইনি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামল। তিনি সেই সময় ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের চেয়ারম্যান। সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার করেন মিডিয়ার সামনে। কি সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন মাইক্রোফোনের সামনে, গমগমে গলাটা শুনতেই ভীষণ মিষ্টি লাগে। আমি লেখক আনিসুল হকের নাম জানি, কিন্ত এই আনিসুল হক কে? তিনি নাকি বিটিভিতে উপস্থাপনা করতেন একটা সময়ে, আমাদের জন্মেরও আগে। তখনও তার জীবনের বহুমূখী প্রতিভা সম্পর্কে আমি জানিনা। জানার চেষ্টাও হয়তো করতাম না, যদি তিনি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন না করতেন!

ঢাকা থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরের জেলা ফেনী। সেখানেই আনিসুল হকের বেড়ে ওঠা। জন্মেছিলেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রীধারী এই মানুষটা দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে উপস্থাপনার মাধ্যমে। আনন্দমেলা আর অন্তরালে নামের দুটো অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেব তিনি। আশির দশককে বলা হয় বিটিভির স্বর্ণযুগ, সেই স্বর্ণযুগের স্বর্ণালী প্রজন্মের একজন তো তিনি নিজেও ছিলেন। নিজের প্রতিভার স্মাক্ষর রেখে মানসম্মত অনুষ্ঠান উপহার দিতেন দর্শকদের, মানুষের ভালোবাসাটা তাঁর প্রাপ্যই ছিল।

১৯৯১ সালে একটা অবিশ্বাস্য কাজ করে বসলেন তিনি, অন্তত উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনায় নিলে, বিরল একটা দৃষ্টান্তই স্থাপন করে ফেললেন টিভি পর্দায়। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ দুই নেত্রী খালেদা জিয়া আর শেখ হাসিনাকে নির্বাচনের আগে নিয়ে এলেন এক অনুষ্ঠানে, সেটার উপস্থাপনাও করেছিলেন তিনি। এমন কিছুর কথা এখন কল্পনা করতেও তো সাহস লাগে!

নিজের ব্যবসায় নামার পরে উপস্থাপনায় অনিয়মিত হয়ে পড়েছিলেন, একটা সময়ে তো উপস্থাপনা ছেড়ে পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হয়ে উঠলেন! আশির দশকের শেষ দিক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের পুরো সময়টায় বাংলাদেশের তৈরী পোশাকখাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যে অল্প কিছু মানুষ সামনে থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, আনিসুল হক তাদের একজন। শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন, দারুণ কর্মদক্ষতা আর পরিশ্রমে নিজের প্রতিষ্ঠানকে তুলে এনেছিলেন শীর্ষে, পরিণত হয়েছিলেন দেশের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ীদের একজনে। কিছু মানুষ আছেন, তারা যেখানেই পা রাখেন সেই জায়গাটা নিজেদের প্রতিভার আলোতেই রাঙিয়ে দেন। আনিসুল হক মানুষটাও তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন।

এফবিসিসিআই থেকে বিদায় নেয়ার পর বেশ কিছুদিন আলোচনার বাইরেই ছিলেন তিনি, মাঝে সার্ক চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে সবটুকু আলো তিনি নিজের দিকে কেড়ে নিলেন ২০১৫ সালে। ঢাকাকে ততদিনে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে, উত্তর-দক্ষিণ মিলিয়ে দুটো সিটি কর্পোরেশন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলো, উত্তরে আওয়ামীলীগ বেশ খানিকটা চমক উপহার দিলো আনিসুল হককে মনোনয়ন দিয়ে। টিভি পর্দার জনপ্রিয় মুখ, সফল ব্যবসায়ী থেকে এবার মানুষটা নেমে গেলেন রাজনীতির মাঠে!

নিজেকে অবশ্য কখনোই রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিতে চাননি আনিসুল হক, বরাবরই বলে এসেছেন, আওয়ামীলীগ নয়, বরং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থী তিনি। প্রচারণা চালানোর সময় বলতেন, শেখ হাসিনার আশীর্বাদ তাঁর সঙ্গে আছে। পরিচ্ছন্ন ইমেজের একজন মানুষ তিনি, জনগণের রায় নিয়েই ভোটে জিতে মেয়র হলেন তিনি। পত্রিকার পাতায় তাঁকে নিয়ে বিশাল কলাম পড়ি তখন, তাঁর সাফল্যগাঁথা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়। কিন্ত রাজনীতির বাইরে থেকে আসা একটা মানুষ কতটা কি করতে পারবেন মেয়র হিসেবে? বহুবছরের অবহেলায় মৃতপ্রায় ঢাকা নগরীতে প্রাণ ফিরিয়ে আনার যেসব প্রতিশ্রুতি তিনি ইশতেহারে দিয়েছেন, তার কয়টা পূরণ করা সম্ভব? মেয়র বলি, প্রশাসক বলি, কম তো দেখেনি ঢাকা। কাজের কাজ করার মানুষ তো ছিলেন না তেমন কেউ!

তবে আনিসুল হক ভেবেছিলেন অন্যরকম। বাকীরা শুধু বলে, তিনি বলার পাশাপাশি নিজের দেয়া কথা রাখার ব্যপারেও খুব আন্তরিক- সেটা তিনি দেখিয়ে দিলেন নগরপিতার চেয়ারে বসার পর থেকেই। বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় তলানীতে থাকা ঢাকা শহরের একটা অংশের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে, সেই দুর্নাম ঘোচানোর দায় মাথায় নিয়ে তিনি কাজে নামলেন আঁটঘাট বেঁধে।

তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের বেহাল দশা, রাস্তা দিয়ে মানুষ হাঁটার জায়গা নেই ট্রাকের ভীড়ে, স্ট্যান্ডের ভেতরে না রেখে সবাই ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখছে রাস্তার ওপরে, রিক্সায় করে আধা কিলোমিটার জায়গা পার হতে সময় লেগে যায় ঘন্টাখানেক। আনিসুল হক বসলেন ট্রাক মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে, তাদের বোঝালেন, মানুষের চলাচলের সমস্যা হচ্ছে তাদের কারণে। সোজা আঙুলে সবসময় ঘি ওঠে না, এবারও উঠলো না। আনিসুল হক ভদ্রলোক মানুষ, তাঁর মিষ্টি কথায় পাত্তা দিলেন না বছরের পর বছর জায়গাটা দখল করে রাখা শ্রমিকেরা। উল্টো তাকেই সেখানে অবরুদ্ধ করে রাখলেন ঘন্টা তিনেক! মেয়র সাহেব বুঝে গেলেন, এভাবে কাজ করে লাভ হবে না। এই ঢাকা শহরে জমে থাকা ময়লা পরিস্কার করতে হলে আবর্জনার স্তুপে নামতে হবে, গায়ে মাখতে হবে কাদা। তিনি কঠোর হলেন, পুলিশ এলো, আর্মি এলো। ফলাফল? এক সপ্তাহে পুরো এলাকা ফাঁকা। এই পথ দিয়ে যারা চলাচল করতো, কেউ ভাবতেই পারেনি রাস্তাটা এতখানি চওড়া ছিল! সেই রাস্তার সংস্কার কাজ করেছেন তিনি, সেখানে রাস্তার মাঝে লাগিয়েছেন গাছের চারা, ঢাকা শহরের সৌন্দর্য্যবর্ধন তার কাছে গুরুত্ব পেয়েছে বরাবরই।

এরপর থেকে ভাংচুর করাটা তার কাছে নেশার মতো হয়ে গিয়েছে। তার এলাকায় কোথায় কি অবৈধ স্থাপনা আছে, কে রাস্তা দখল করেছে, সরকারী জমি নামে বেনামে নিজের আয়ত্বে নিয়ে রেখেছে সেসবের লিস্ট বানিয়েছেন আনিসুল হক, সিটি কর্পোরেশনের লোকজন আর বুলডোজার নিয়ে ছুটে গেছেন সেখানে, একের পর এক গুঁড়িয়ে দিয়েছেন সব অবৈধ স্থাপনা। মরিয়ম টাওয়ার সংলগ্ন অবৈধ স্থাপনা ভেঙে তিনি রাস্তা বের করেছেন, গুলশান অ্যাভিনিউ’র ওপরে যাতে যানবাহনের চাপ একটু কমে। মিরপুরে রাস্তা প্রশস্ত করার জন্যে দখলদারদের বানানো ঘরবাড়ী ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন তিনি, শ্যামলী থেকে গাবতলী হয়ে আমিনবাজার পর্যন্ত সড়কটা প্রশস্ত হয়েছে, যাবজট কমেছে অনেকটাই- এই কৃতিত্ব তো তারই! ঢাকা শহরের যানজট কমাতে চার হাজার সরকারী বাস নামানোর উদ্যোগের কথা তো অনেকেই জানেন, এখনও আলোর মুখ দেখেনি সেই প্রকল্প। গুলশান থেকে বনানীগামী যাত্রীদের সুবিধার জন্যে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে এসি বাস নামিয়ে চালু করেছিলেন ‘ঢাকার চাকা’ প্রকল্প, সেটার সুবিধা তো ভোগ করছেন এই এলাকার মানুষজন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অবৈধ দখলদারদের একটা তালিকা নিয়ে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। বলেছিলেন, এরা সবাই আমাদের পরিচিত, এরাই ঢাকা শহরের দুরবস্থার বড় কারণ। শেখ হাসিনা তাকে বলেছিলেন- “এদের আমি চিনি না, এরা কেউ আমার লোক নয়। তুমি তোমার কাজ করে যাও”। আনিসুল হক তার কাজ চালিয়ে গেছেন। গুলশান-বনানী-উত্তরা হয়ে কারওয়ান বাজার, অবৈধ দখলদারদের যমে পরিণত হয়েছেব তিনি। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে স্থাপনা উচ্ছেদ করেছেন, কাউকে ভয় পাননি, কারো তোয়াক্কা করেননি বিন্দুমাত্র। সিটি কর্পোরেশনের কাজের জন্যে ই-টেন্ডার সিস্টেম চালু করেছেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়া বন্ধ হয়ে গেছে এই এক সিদ্ধান্তেই। সরকারী দলের নেতাকর্মী বা সিটি কর্পোরেশনের কমিশনারেরাও একারণে নাখোশ ছিলেন তার প্রতি, শোনা যায় আওয়ামীলীগের দলীয় সভাতেও নাকি তার ব্যপারে অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্ত হাইকমান্ড পাত্তা দেয়নি এসব অভিযোগে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাঙালী হয়েও যে মানুষগুলো মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিরোধিতাকারী ছিলেন, তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন মোনায়েম খান। পূর্ব বাংলার গভর্ণর ছিলেন তিনি সেই সময়ে। একাত্তরেই বীর মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করেছিল এই অমানুষটাকে। কিন্ত তার বাসভবন বাগ-ই-মোনায়েম গত পঞ্চাশ বছর ধরেই অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে ঢাকা শহরে, বেশ বড়সড় একটা জায়গা নিয়ে। সেই বাগ-ই-মোনায়েম তিনি উচ্ছেদ করেছেন, ভেঙে গুড়ো করে দিয়েছেন স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রাক্তনে এই বাসস্থানকে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী ধরেও যে কাজ কেউ করার দরকার মনে করেনি, সেটাই করে দেখিয়েছেন আনিসুল হক!

সদা হাস্যোজ্জ্বল সৌম্যদর্শন এই মানুষটার এমন রুদ্রমূর্তি শুধু আইন অমান্যকারীদের জন্যেই ছিল। সাধারণ মানুষের জন্যে তিনি সবার প্রিয় আনিস ভাই, যার কাছে যেকোন সমস্যার সমাধান চাওয়া যায়, যে মেয়রকে ফোন দিলেই তিনি সেটা রিসিভ করেন, সমস্যার কথা শুনে সেটা সমাধান করতে তৎপর হয়ে ওঠেন। মেয়র হবার পরে নিয়মিতই নিজের ফেসবুক পেইজে লাইভে এসেছেন, শুনেছেন তার নির্বাচনী এলাকার মানুষজনের সমস্যার কথা, আশ্বাস দিয়েছেন সমাধানের। সেসব যে বৃথা বাক্যব্যায় নয়, সেটা ঢাকা উত্তরের মানুষ জানেন।

উপস্থাপনা ছেড়েছিলেন অনেক আগেই কিন্ত আবারও টিভি পর্দায় সঞ্চালকের ভূমিকায় ফেরার একটা সম্ভাবনা জেগেছিল। বাংলাদেশে যখন ‘হু ওয়ান্টস টু বি এ মিওনিয়ার’ এর আদলে ‘কে হতে চায় কোটিপতি’ অনুষ্ঠানটা তৈরী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তখন সঞ্চালক হিসেবে প্রথমে আনিসুক হকের নামটাই এসেছিল আয়োজকদের মনে। আনিসুল হক নিজেও রাজী হয়েছিলেন, কিন্ত পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সরে দাঁড়ান এই প্রোজেক্ট থেকে।

মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগটা বরাবরই বজায় ছিল তার। অসহায় শিল্পীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সবসময়। শুধু নিজে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি, সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন, হাত ধরে নিয়ে এসেছেন পরিচিতদের। লাকী আখন্দ, আলাউদ্দিন আলী বা আবদুল জব্বারের মতো শিল্পীদের সাহায্য করার জন্যে নিজের একক উদ্যোগে গড়ে তুলেছিলেন ‘শিল্পীর পাশে ফাউন্ডেশন’। বন্ধু লাকী আখন্দের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান গেয়েছেন, মাথায় হাত বুলিয়ে এসেছেন বন্ধুর। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, লাকী চলে যাবার অল্প ক’দিন বাদে এভাবে চলে যাবেন আনিসুল হকও! তাঁর প্রতিষ্ঠিত নাগরিক টিভি এখন অভিভাবকশূন্য, যে চ্যানেলটার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গৎবাঁধা অনুষ্ঠানের ধরণ পাল্টে দিয়ে দর্শকদের সুস্থ বিনোদন দেয়ার আশায়, সেটাকেই শিশু অবস্থায় রেখে চলে গেলেন আনিসুল হক।

জীবনের চলতি পথে শূন্য থেকে শিখরে ওটার একটা গল্প লিখে রেখেছেন মানুষটা। মেয়র পদে নির্বাচন করার সময় একবার জনসংযোগ করতে এসে বলেছিলেন-

“বলা হচ্ছে, আমি নাকি অনেক বড় লোক। মেয়র হলে নাকি গরিবের কথা বলতে পারব না। যারা এইসব বলে, ওরা জানে না আমার জীবনের কষ্ট। ওরা জানে না আমার মা কষ্ট করে আমার বাবার প্যান্ট রিফু করে দিতেন, একটা প্যান্ট কিনতেন না। ওরা জানে না যে আমি বাবার ৬৪ হাজার টাকা নিয়ে জীবন শুরু করতে গিয়ে এক রাতে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলাম।”


চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে শেখেননি, হার মানেননি কখনও। ভয় করেননি কাউকে। মাত্র দুটো বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, দুই বছরেই অনেকটা পাল্টে ফেলেছিলেন ঢাকার খোলনলচে, অনেক কিছুই বাকী রয়ে গেছে, আরও অনেক কিছু করার ছিল, কিন্ত জীবনের কাছে সেই সময়টুকু আর পেলেন না তিনি। ঢাকা শহরের চারশো বছরের ইতিহাসে প্রশাসক বা মেয়র তো অনেক এসেছে। কেউ বছরের পর বছর গদিতে বসে ছিলেন। কাজের কাজ কিচ্ছু হয়নি, তাদের নামটাও মনে রাখেনি কেউ। আনিসুল হক চিরবিদায় নিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্তির মাত্র দুই বছরের মাথায়, কিন্ত তাঁকে সবাই মনে রাখবে। কারণ এই মানুষটা আমাদের শহরটাকে বদলে দিতে চেয়েছিলেন, বদলে দিচ্ছিলেন একটু একটু করে। একদিন ঢাকা হয়তো বিশ্বের নামকরা পরিচ্ছন্ন শহরগুলোর একটি হয়ে যাবে, কোটি মানুষের বসবাসের এই মেগাসিটি একদিন বাসযোগ্য শহরের তালিকায় সবার ওপরের দিকেই উঠে আসবে। সেদিনও আমরা আনিসুল হককে স্মরণ করবো। এই মানুষটার হাত ধরেই তো বদলে যাওয়ার শুরুটা হয়েছিল।

ব্যক্তিগত কাজে আমাকে নিয়মিতই সাতরাস্তা হয়ে ফার্মগেট বা কারওয়ান বাজার যেতে হয়। রিক্সায় চড়ে ফাঁকা এই রাস্তায় যেতে যেতে আনিসুল হকের কথা মনে পড়ে আমার। কি অসম্ভব এক যুদ্ধ করেই না এলাকাটা অবৈধ দখলমুক্ত করেছিলেন মানুষটা! রোড ডিভাইডারের ওপর লাগানো গাছগুলো বড় হচ্ছে, ক’দিন পরে ওরা ছায়া দেবে, ইট-পাথর আর কংক্রীটের এই নগরীতে খানিকটা সুশীতল বাতাসের যোগান দেবে ওরা। আনিসুল হক নেই, তার রেখে যাওয়া কীর্তিগুলো আছে। ওরা থেকে যাবে এভাবেই, ক্ষণে ক্ষণে আমাদের মনে করিয়ে দেবে, একটা মানুষ ছিলেন, ঢাকাকে বসবাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে যিনি লড়াই করেছিলেন শত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে।

সকালে ফেসবুকের নিউজফিডে একটা ভিডিও দেখলাম। সিটি কর্পোরেশনের আয়োজিত একটা কনসার্টে আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে মাইক হাতে গাইছেন আনিসুল হক, হ্যাপি আখন্দের গাওয়া বিখ্যাত গান- “আবার এলো যে সন্ধ্যা”। যে ঢাকা শহরকে আপনি বদলে দিতে চেয়েছিলেন, সেই ঢাকায় সন্ধ্যা নামবে, সাঁঝবাতির দল জ্বলে উঠবে প্রতিদিনের মতো। যে শহরটাকে বদলে দেয়ার নেশায় গত দুটো বছর একটানা ছুটে বেড়িয়েছেন, সেখানে আপনি আর ফিরবেন না কখনও। সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে আপনার গম্ভীর মুখটা দেখা যাবে না টিভি পর্দায়। গানের লাইনের মতোই ওই দূর আকাশের প্রান্তে হারিয়ে গেছেন আপনি, সাতরঙা মেঘেদের দেশে এখন থেকে আপনার নিত্য বসবাস! যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে খুব ভালো থাকুন আনিসুল হক। আমাদের প্রার্থনা আর ভালোবাসা আপনার সঙ্গে থাকবে সবসময়।

Post a Comment

[blogger]

MKRdezign

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget