যে ১০টি বৈশিষ্ট্য থাকলে আপনার কখনই ডাক্তার হওয়া উচিত নয়! -  ডা. হাবিবুর রহিম 



চিকিৎসা পেশার প্রতি মানুষের অকৃত্রিম ভালো লাগার ইতিহাস অনেক দিনের। এই আধুনিক ও গতিশীল সময়ে সন্তানের একটি সুন্দর সচ্ছল সম্পূর্ণ জীবন এককথায় সম্মান ও সম্মানির প্রাচুর্যের নিশ্চয়তা পেতে মা-বাবাদের এখনো প্রথম পছন্দ চিকিৎসা পেশা। যদিও মা-বাবার ইচ্ছায় মেডিকেলের প্রাঙ্গণে এসে পরবর্তী সময়ে প্রচণ্ড চাপ আর বাধ্যবাধকতা পূর্ণ জীবনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ডাক্তার না হতে পারা কিংবা এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাওয়া মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

এছাড়া এ পেশায় এসে প্রচণ্ড পেশাগত ব্যস্ততার ঘেরাটোপে বাঁধা পড়ে অনেকের জীবনই দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। ফলে তার কাছে যেমন এই পেশা দারুণ দুর্বহ বোঝার মতো মনে হয় তেমনি তার কাছে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষরাও শিকার হন অকারণ দুর্ব্যবহারের। অথচ এমনটা নাও হতে পারত।

নিজের মানসিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর লক্ষ রেখে পেশা নির্বাচন করলে এই বিপর্যয় এড়ানো যায়। তাই প্রথমেই ব্যাপারগুলো মাথায় রাখা জরুরি। আজকের এই লেখার অবতারণা সেই প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করেই।

১. আপনার আচরণ যদি খুব রূঢ় হয়

চিকিৎসকের একটা সুন্দর হাসি একটা সান্ত্বনার বাক্য একজন রোগীর উপসর্গ অর্ধেক কমিয়ে দিতে পারে। তার চিন্তিত মনে দিতে পারে আস্থার সুশীতল পরশ। আর আপনি যদি অল্পতেই রেগে যান তবে রোগীর মানসিক অবস্থার আরো অবনতির কারণ হতে পারেন আপনি। এক্ষেত্রে চিকিৎসা পেশায় না এসে সামরিক বাহিনীর মেজর কিংবা অন্য কোনো পেশাকে আপনি বেছে নিতে পারেন। সেখানে হয়তো আপনি মানিয়ে যেতে পারেন কিন্ত চিকিৎসা পেশায় কখনোই এমন আচরণ মানানসই নয়। একজন মানুষের সঙ্গে অযথা খারাপ আচরণ করার অধিকার আপনাকে কখনোই দেয়া হয়নি।

২. আপনি যদি বেশি কথা পছন্দ না করে থাকেন!

ছোটবেলা থেকেই আপনি বেশি কথা শুনতে পছন্দ করেন না। কেউ একটু বেশি কথা বলে তাহলে আপনার বিরক্তির সীমা ছাড়িয়ে যায়। কেউ একটু বেশি প্রশ্ন করলেই আপনি চুপ করে থাকেন। জবাব দেয়া তো দূরের কথা আপনার মেজাজের স্পিডোমিটারের কাঁটা লাফিয়ে সপ্তমে চড়ে বসে। এক্ষেত্রে ডাক্তার না হওয়াটাই আপনার জন্য ভালো। কারণ একজন ডাক্তারকে এ ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় নিয়মিত।

আর মানুষ শুধু রোগের চিকিৎসার জন্য তো ডাক্তারের কাছে আসেন না আসেন মূলত রোগীর চিকিৎসার জন্য।

৩. আপনি যদি প্রচুর ক্ষমতা চান

আপনার ইচ্ছা আপনি অনেক প্রভাবশালী জীবনযাপন করবেন । সবাই আপনাকে স্যার স্যার বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলবে। আর আপনার কাছে কাউকে আসতে হলে কয়েক স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা স্তর ভেদ করে আসতে হবে!

তবে ডাক্তারি আপনার জন্য নয়। এ যাবৎকালে শুধু ডাক্তারি করে এত ক্ষমতা কেউ কখনো বাগাতে পারেননি। হ্যাঁ, এ পেশায়ও প্রভাব আছে তবে তা মানুষের হৃদয়ের ওপর, যা আপনি এমনিতেই অর্জন করতে পারবেন এবং তা কোনো ত্রাস সৃষ্টি না করেই!

এতে যদি আপনি সন্তুষ্ট থাকতে না পারেন তাহলে বরং আপনি ক্ষমতার রাজনীতি করুন। হতেও পারে একসময় আপনি এ রকম ক্ষমতার সন্ধান পেয়েও যেতে পারেন। আপনি জানেন একজন ডাক্তারের জীবন এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। রোগী, রোগীরা লোকজন ভালোবেসে আপনাকে ভাই বলেও ডাকবে। রাস্তার একটা নিঃস্ব ভিক্ষুকও প্রবল আবেগে আপনাকে 'বাবা' 'বাবা' বলে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে চাইবে।

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সন্তানের সুস্থতার আনন্দের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হতদরিদ্র মহিলাটি তার ছেড়া আঁচলটা মাথায় দিয়ে তার গাছের প্রথম পেঁপেটা কিংবা কাঁঠালটা আপনি খাচ্ছেন; এই অবস্থায় দেখতে চাইবে। এই অযাচিত ভালোবাসার তীব্রতা যদি আপনি সইতে না চান; এগুলোকে যদি আপনার কাছে একান্তই উৎকট ঝামেলা বলে মনে হয় তবে দয়া করে আপনি ডাক্তার হওয়ার ঝামেলায় যাবেন না।

৪. আপনি যদি কর্পোরেট লাইফ দারুণভাবে পছন্দ করেন

আপনি ভালোবাসেন ছিমছাম নির্ঝঞ্ঝাট একটা জীবন। যেখানে বাড়তি কোনো উৎপাত উপদ্রব নাই। নিয়মিত ব্যস্ততার উঁকিঝুঁকি নাই। নয়টা-পাঁচটা অফিসের পর একেবারেই নিজের মতো একটা নিস্তরংগ সময় আপনার প্রবল আকাঙ্ক্ষিত হয় তাহলে আপনি ডাক্তার হলে ভুল করবেন। ডাক্তারদের জীবনে অবসর শব্দটি এক ধু ধু বালুচর মাত্র। রাতের যে কোনো গভীরতায় আপনার প্রতি আহ্বান চলে আসতে পারে মানবতার সেবার। সেক্ষেত্রে "এই রোগীর ভিজিটের টাকা আমার দরকার নেই। এমনিই আমার অনেক টাকা। আমি যেতে পারব না এখন!" এ রকম চিন্তা করে কখনোই নির্লিপ্ত থাকতে পারবেন না আপনি। সেই নিশীথেও আপনাকে আসতেই হবে এই পীড়িতের আহ্বানে, পেশার প্রয়োজনে। এত ঝক্কি সামনে রেখে তবুও কী ডাক্তার হতে চান আপনি?

৫. আপনি যদি চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পান

আপনি চান না কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে। আপনার চাওয়া জীবনটা অঙ্কের মতো মিলে যাক সব সময়। তবে ডাক্তার হলে খুব ঝামেলায় পড়বেন আপনি। এখানে একই চিকিৎসায় কেউ দারুণ দ্রুত সাড়া দিয়ে সুস্থ হয়ে উঠবেন আর কারো কারো ক্ষেত্রে আপনি নাকানি-চুবানি খেয়ে একেবারে কাহিল হয়ে যাবেন। তবু হাল ছাড়তে পারবেন না আপনি। রোগীকে সুস্থ করার চেষ্টাটুকু আপনাকে করতেই হবে। ভেবে দেখুন নেবেন কী না এই কঠিন চ্যালেঞ্জ?

৬. নতুনত্বের প্রতি আপনার দারুণ মোহ

আপনি দুদিন পরপর আপনার গ্যাজেট বদলান। বাইক বদলান। কখনো কখনো সঙ্গীও বদলান। যেখানেই সুযোগ থাকে আপনি পরিবর্তন করতে চান। একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে আপনার বেশিদিন আগ্রহ ধরে রাখাটা আপনার জন্য দারুণ কষ্টের তবে আদিকাল থেকে চলে আসা একই মডেলের এই দেহের ওপর চিকিৎসা চর্চা চালিয়ে আপনি তেমন মজা নাও পেতে পারেন।

যদিও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার নিত্যনতুন প্রযুক্তি আপনাকে কিছুটা আনন্দ দিতে পারে। এক্ষেত্রে যদি আপনি খুঁতখুঁতে হয়ে থাকেন তবে আপনাকে ডাক্তারি পেশায় আসা উচিত হবে না।

৭. আপনি যদি খুব লোভী হন

আপনার যদি মনে হয়ে থাকে ডাক্তার হলেই অনেক অর্থসম্পদের মালিক হওয়া যায় যা অন্য পেশায় হওয়া যায় না। তাই আপনি ডাক্তার হতে চান। তাহলে আপনাকে বলছি, আপনার ধারণাটি একদমই ভুল।

চিকিৎসা পেশায় উপার্জন আছে তবে তা অঢেল অর্থ নয়। তবে হ্যাঁ যদি আপনি যদি মনে করেন ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে, ক্লিনিকের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে অনেক টাকার মালিক হবেন; তবে বলব তার চেয়ে বরং চুরি কিংবা ছিনতাইয়ের পেছনে আপনার ট্রেনিং এর সময়টুকু দিন। এতে আপনি অনেক বড়ো চোর কিংবা ছিনতাইকারী হতে পারবেন এবং আরো বেশি উপার্জন করতে পারবেন। ডাক্তার হয়ে 'ছ্যাচরামো' করে উপার্জিত অর্থ আর চোর ডাকাতের উপার্জিত অর্থ ভোগ করা আর মানববর্জ্য ভক্ষণের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই।

৮. আপনি যদি প্রচণ্ড মাত্রায় ভাবুককিংবা উদাসী হন

আপনার মন যদি সব সময় ভাবের জগতে অবস্থান করে। বাস্তবতার চেয়ে কল্পনার জগতেই আপনার আসা যাওয়া বেশি। আপনি হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যেতে পছন্দ করেন। এই পৃথিবী সংসার কখনো কখনো আপনার কাছে বাহুল্য মনে হয়। তবে মেডিকেল কলেজের বদ্ধ খাঁচা আর ফিনাইলের কড়া গন্ধ আপনাকে বারবার আশাহত করবে কিংবা আপনাকে দূরে ঠেলে দেবে নিয়মিত। আপনার এই ভাবের দ্বৈরথ দারুণ ভোগাবে আপনাকে এবং আপনার প্রিয় রোগীদেরকেও! তবে হ্যাঁ এই ভাবালুতা যদি অন্য পাঁচ-দশটা মানুষের মতো সীমিত পর্যায়ের থাকে তাহলে অবশ্য তা কোনো সমস্যাই না। এক্ষেত্রে মাত্রাজ্ঞান থাকাটা আবশ্যক।

৯. আপনি যদি আত্মবিশ্বাসী না হয়ে থাকেন

আপনার সাহসের প্রচণ্ড অভাব। অল্প কিছুতেই দারুণ নার্ভাস ফিল করেন। হঠাৎ কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে প্রচণ্ড মাত্রায় দোদুল্যমনতায় ভোগেন। বারবার প্রশ্ন করে আপনি আপনার আশপাশের মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন; অল্প কিছুতেই হতাশ হয়ে যান; হাল ছেড়ে দেন তবে আপনার জন্য চিকিৎসা পেশা নিতান্তই কষ্টকর বৈকি! এই পেশা আপনাকে বারবার নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে আর তা করতে না পারলে আপনি নিজের অসহায়ত্ব দারুণভাবে অনুভব করবেন।

১০. আপনার মধ্যে যদি মানবতার জন্য সত্যিকারের ভালোবাসার অভাব থাকে

আপনি মানুষের দুঃখে দর্শকের ভূমিকায় বসে যান। এই সেই মন্তব্য করে নিজের দরদ জাহির করার চেষ্টা করেন ঠিকই কিন্তু তাদের সত্যিকারের উপকার করতে চাওয়াটা আপনার কাছে সময় নষ্ট মনে হয় কিংবা আপনার মনে হয় "আরো কত মানুষই তো আছে সেবা করতে শুধু শুধু আমি কেন যাব?" তবে দয়া করে এ পেশায় আপনার আসার দরকার নেই। আপনি এসে এই পেশার দুর্নাম আর বাড়াবেন না দয়া করে, আরো কত মানুষই তো আছে মানুষের সেবা করার!

সেদিন প্রসঙ্গান্তরে এক পারিবারিক বৈঠকে জনৈকা আত্মীয়া বলেছিলেন, তুমি এতদিন পড়ালেখা করে যেই অর্থ উপার্জন করো তার চেয়ে তো অমুক অন্য বিষয়ে পড়ে আরো বেশি উপার্জন করে! কী লাভ হলো বল তো তাহলে ডাক্তারি পড়ে?

আমি শুধু এটুকু বলেছিলাম, "একজন মানুষ একটা সফটওয়্যার কিংবা ভবন বানিয়ে সৎপথেই হয়তো আরও বেশি উপার্জন করতে পারেন কিন্তু দোয়া আর ভালোবাসা পাওয়ার সুযোগ তাদের কতোটুকু?

মানুষের একেবারে কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুবাদে যেই অকৃত্রিম দোয়াটুকু এই অল্প ক’দিনেই আমরা অর্জন করতে পেরেছি তা কী তিনি পেরেছেন? তাহলে ওই দোয়া আর গভীর ভালোবাসাটুকু সম্বল করেই আমাদের বাঁচতে দিন না!

সৎ থেকেও এ পেশায় যেটুকু সম্পদ উপার্জন করা যায় দোয়া করুন যাতে এতটুকুতেই সন্তুষ্ট হতে পারি। এক জীবনে সুখী হতে আসলে কতটুকুই বা সম্পদ লাগে?"

Post a Comment

[blogger]

MKRdezign

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget