প্রফেসর ইবনে গোলাম সামাদ আর নেই==😭



ইবনে গোলাম সামাদ একটা পূর্ণাঙ্গ নাম নয়। নামের অংশ। মানে গোলাম সামাদের ছেলে। যত আর্টিকেল তার পড়েছি, বই দেখেছি,তার জীবন সম্পর্কে যতটুকু পড়েছি, তা থেকে তার পূর্ণ নাম উদ্ধার করতে পারিনি। রকমারি ডট কম লিখেছে তার আব্বা মোহাম্মাদ ইয়াসিন ও মাতা নছিরন নেছা। তিনি ২৯শে ডিসেম্বর ১৯২৯ সালে রাজশাহীতে জন্ম গ্রহন করেছেন। ১৯৪৮ সালে শিক্ষা সংঘ বিষ্ণপুর থেকে সেকেন্ডারি সমমান পাস করেন, ১৯৪৯ সালে পাস করেন রাজশাহী কলেজ থেকে এইচ এস সি। তেজগাঁও কৃষি ইন্সটিটিউট থেকে স্নাতক করে ইউকে আসেন। সেখান থেকে ফ্রান্সে ডিগ্রী শেষ করে বাঙলাদেশে ফিরে যান, এবং ১৯৬৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ বিজ্ঞানের উপর শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। লেখা লেখি, গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তির সংযোজনে বক্তৃতা ও আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। 

আজ ১৫/০৮/২০২১ বাংলাদেশ সময় ১০টায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। আল্লাহ তাকে যেন জান্নাতুল ফেরদাওউস দান করেন-এই দুয়া করি। 

তার লেখা আমি ইনকিলাবে নিয়মিত পড়তাম। পরে সংগ্রামে ও আমার দেশেও পড়েছি। তিনি ছিলেন শেকড় সন্ধানী লেখক। সমাজ-সংসার, পরিবেশ-প্রতিবেশ, স্বদেশ-স্বার্থ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, আত্মজৈবনিক লেখনি-ধারা, আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা সঞ্জাত দর্শন-চিন্তা-কর্ম ছিলো তার লেখার ঊপজীব্য বিষয়। 

তিনি বাংলাদেশের পট পরিক্রমার একজন বিদগ্ধ অংশিদার ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহনকারী, দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের কাছে ছিলো তার পরিচিতি, শিক্ষা-সংস্কৃতির পরিমন্ডলে তার ছিলো অবাধ যাতায়াত। এই সব সুযোগগুলো তিনি কলমের কালিতে যথেষ্ঠ মিশাতে পেরেছিলেন বলেই তার অনেক তথ্য আমরা ইতিহাসের কাঁচামাল হিসেবে গণ্য করি। এবং গণ্য করি বলেই তার এমন কিছু কথা যা সাধারণ ন্যারিটিভের উলটো দিকের, অথচ মানতে মনে সন্দেহ হয়না। পাকিস্তান আন্দোলন ধর্মীয় আন্দোলন ছিলোনা, দেওবন্দ পন্থীদের পাকিস্তান অনীহা, ১৯৬৫ এর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের ভারতের বিপর্যয়, ১৯৭১ সালে জামাআতে ইসলামির স্বাধিনতা বিরোধিতার বৈধতা এইসব তথ্য তার মুখে মানিয়েছে, এবং তার সেই তথ্য প্রবাহে  হৈ হাংগামা ততো না হওয়ার পেছনে এইটাই মুখ্য কারণ বলে আমার মনে হয়েছে। 

তিনি সাহসী লেখক ছিলেন। মেরুদন্ড তার যেমন সোজা ছিলো, তার উপর ভর করে মুখটাও সচল রাখতেন তিনি। আর চোখদুটোকে বাজের মত তীক্ষ্ণ রাখতেন। তিনি কথা যখন বলতেন রাজশাহীর প্রমত্ত পদ্মার ঢেও সেখানে আছড়ে পড়তো, স্রোতের গতি সেথা শক্তিময়তার সাথে প্রবাহ পেত, এবং ফারাক্কার বাঁধের মত গোঙরানীর শব্দ ও বুঝতে পেতাম তার লেখার পরতে পরতে।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কথা, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কথা, জেনারেল এরশাদের ব্যাপারে তার মনোভঙ্গিতে আমি ঐসব গুণগুলো পেয়েছি। 

তিনি পাকিস্তান আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও সম সাময়িক ধারা বর্ণনার ক্ষেত্রে ফটোগ্রাফার ছিলেন না, ছিলেন ফটো জার্নালিস্ট। তার শিল্পিত রূপগুলোতে তিনি নিজস্ব রঙের প্রলেপ এমন ভাবে দিয়েছেন যা সমস্ত লেখক, গল্পকার, গায়ক ও কবিদের থেকে তার লেখাগুলোকে একদম আলাদা করে দাঁড় করিয়েছেন। 

তিনি একাধারে হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি, ফরাসি, আরবী ও ফার্সির দখল নিয়েছিলেন। এতে তার ভাষা কিছুটা শৃংখলিত হলেও নানান ভাষার আবছা রঙে ও ভিন্ন সুগন্ধির মিশ্রনে সুখপাঠ্য হয়ে উঠতো। নানান সংস্কৃতি ও তথ্য তার লেখায় যেমন রুচি বাড়াতো, তেমন বিশ্ব ইতিহাসের তারকাময় ইশারা তার লেখার গগণে জ্বলজ্বল করতো। ফলে তা পদ্যরীতির মানুষের কাছে যেমন শ্রদ্ধার ছিলো, গদ্যরীতির সাধারণ্যে তা ব্যাপক পঠিত হতো। 

তিনি বুদ্ধিজীবি সমাচারে আস্তিক ন্যারিটিভের স্রোতে থাকা মানুষ ছিলেন। যে মারাত্মক ঢেও বাংলাদেশকে হিন্দুত্বের মন্দিরে বলি দিতে কালফণির মত মাথা উঁচু করে থাকতো। তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি তার লেখা ও গবেষণায় সেই বাংলাদেশকে সবুজ মসজিদে সেজদারত বানাতে তৎপর থাকতেন। তার পূর্বসূরি নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে সতীর্থ মুসলিম বুদ্ধিজীবিদের সাথেই ছিলো তার আত্মার সম্পর্ক। অনুজ ইসলামিস্টদের জন্য তার বুক যেমন প্রশস্ত ছিলো, দিল ছিলো তার চেয়ে অনেক উদার। ফলে তার পা যেমন ইসলাম পন্থীদের অলিন্দে সেঁটানো ছিলো, হাত দুটোও ছিলো ইসলাম্পন্থীদের লেখার কাগজে সদা ব্যস্ত। 

তার জ্ঞানের সীমাটা তিনি এত বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, তার উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ঝর্ণাধারায় মিশে কল্ললিত হয়েছে ইতিহাস পাঠ, চিকমিক করেছে দর্শনের ফেনায়িত রং,তরঙ্গ তুলেছে সমাজবিজ্ঞান ও নৃৃতত্বের ঘাত প্রতিঘাত, স্রোতধারা তৈরি করেছে ধর্মের বয়ান প্রতিবয়ান। রাজনীতিতে তিনি যেমন খবর রাখতেন, অর্থনীতির বাজারেও তিনি নানা অলিগলি ঘুরতেন, সাহিত্যের সরোবরে ফোটা উৎপলের রূপ মাধূর্যেও তিনি স্নাত হতেন। সুবিধা ছিলো তিনি গবেষক ছিলেন, ফলে এমন কোন বিষয় ছিলোনা যেখানে তার নখ বসতোনা। বলছিনা তিনি খামছে আনতেন নতুন নতুন তথ্য, বরং তার যোগ্যতা ছিলো জ্ঞানের অষ্টাদশী শশীবালাদেরকে তার গানের সুরে ঘুঙ্গুরি পায়ে নাচ দেখাতে বাধ্য করতে পারতেন তিনি। সে জন্য এতো প্রবীন হয়েও তার লেখায় নবিনতার ছাপ ভোরের আলোময় পূবাকাশের মত ফুটাতে পারতেন। 

তার কপালে সাজদার দাগ ছিলো, পরণে তাক্বওয়ার পোষাক ছিলো, মনে তাওহীদের অবিমিশ্রিত নিষ্ঠা ছিলো, হাত ছিলো পরোপকারে প্রলম্বিত। তিনি আঘাত খেতেন দিতেন না, সমালোচনা করতেন তবে ইসলামি আদব ও পশ্চিমের অব্জেটিভিটির সমন্বয় করতেন। তিনি অশ্লীল ছিলেন না, ভাষাকে রাস্তার বালকদের মুখের লালা থেকে পবিত্র রাখতেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো তার কাছে গেলে হয় তিনি বন্ধু হতেন, নতুবা শিক্ষক অথবা ছাত্র। ফলে যারা একবার তার কাছে গেছে তাকে মনে গেঁথে ফেলেছে। আমি জানি তার ইন্তকালে আমার মত সবারই চোখে প্রচুর ঢল, মনে ব্যথার প্রিয়জন হারানোর ক্রন্দন, আর দুহাত হয়ত আল্লাহর কাছে উর্ধায়িত।

Post a Comment

[blogger]

MKRdezign

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget