প্রবাসের নীরব যুদ্ধদূরের আলো, বুকের আঁধার — একজন প্রবাসীর অকথিত গল্প

রাতটা আজও অদ্ভুত নীরব। জানালার বাইরে আলো ঝলমলে শহর, উঁচু দালান, ব্যস্ত রাস্তা — সবকিছু যেন জীবন্ত। কিন্তু আমার ভেতরটা ঠিক তার উল্টো, নিঃশব্দ, ক্লান্ত, শূন্য। এই শহর আমাকে চেনে না, আমিও তাকে চিনি না। তবুও প্রতিদিন এই অচেনা শহরের ভিড়েই নিজেকে হারিয়ে ফেলি, আবার খুঁজে পাই — কিন্তু পুরোটা নয়, কিছুটা কম, কিছুটা ভাঙা।
প্রবাস জীবনটা বাইরে থেকে যত সহজ মনে হয়, ভেতরে ততটাই কঠিন। এখানে কেউ আপনার কষ্ট দেখে না, কেউ আপনার রাত জাগা চোখের নিচের কালি খেয়াল করে না। শুধু কাজ, কাজ আর কাজ। সকাল থেকে রাত — একটা নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা জীবন। নিজের জন্য সময় বলতে কিছু নেই, নিজের ইচ্ছা বলতে কিছু নেই। সবকিছুই যেন দায়িত্বের বোঝার নিচে চাপা পড়ে যায়।
মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে — হুট করে সব ছেড়ে চলে যাই। ফিরে যাই সেই চেনা শহরে, সেই চেনা গলিতে, যেখানে প্রতিটা মুখ পরিচিত, প্রতিটা হাসি আপন। যেখানে মা ডেকে বলে "খেয়ে নাও", যেখানে বাবার কণ্ঠে শক্তি আছে, যেখানে সন্তানের ছোট ছোট আবদারগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। কিন্তু বাস্তবতা এত সহজ না। এই দূরত্ব, এই ত্যাগ — সবই তো একটা ভবিষ্যতের জন্য, একটা ভালো দিনের আশায়।
প্রতিদিন রাতে ফোনটা হাতে নিই। ভিডিও কলে দেখি প্রিয় মুখগুলো। মেয়ের হাসি, স্ত্রীর কণ্ঠ, মায়ের মমতা — সবকিছু স্ক্রিনে আটকে থাকে। ছুঁতে পারি না, কাছে নিতে পারি না। শুধু শুনি — "কবে আসবা?" এই প্রশ্নটা যেন বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধে থাকে। উত্তর থাকে না, শুধু একটা মিথ্যা আশ্বাস দিতে হয় — "শিগগিরই আসবো।"
এখানে কাঁদারও সময় নেই। চোখে পানি আসলেও তা মুছে ফেলতে হয়, কারণ এই দেশে দুর্বলতা দেখানোর সুযোগ নেই। এখানে সবাই নিজের লড়াইয়ে ব্যস্ত। সবাই হাসে, কিন্তু সেই হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে হাজারো না বলা গল্প, হাজারো চাপা কান্না।
কাজের জায়গাটাও একরকম যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতিটা দিন নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন চাপ। শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু থামার সুযোগ নেই। কারণ থামলেই পিছিয়ে পড়তে হবে। আর পিছিয়ে পড়ার ভয়টাই সবচেয়ে বড় ভয় — এই ভয়ের সাথেই প্রতিদিন যুদ্ধ করি, নিজের সাথে, পরিস্থিতির সাথে।
অনেক সময় মনে হয় — আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি? নাকি শুধু দিন পার করছি? এই যন্ত্রের মতো জীবন কি আসলেই জীবন? যেখানে হাসি আছে কিন্তু আনন্দ নেই, যেখানে ঘুম আছে কিন্তু শান্তি নেই, যেখানে টাকা আছে কিন্তু ভালোবাসার স্পর্শ নেই।
প্রবাসে টাকা আসে, কিন্তু তার সাথে সাথে অনেক কিছু হারিয়েও যায়। হারিয়ে যায় নিজের মানুষদের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো, হারিয়ে যায় উৎসবের আনন্দ, হারিয়ে যায় নিজের শিকড়ের টান। ঈদের দিন যখন সবাই নতুন কাপড় পরে নামাজে যায়, একসাথে খায়, হাসে — আমি তখন দূরে বসে শুধু দেখি। মনে হয়, আমি যেন সেই গল্পের বাইরে থাকা একটা চরিত্র।
বন্ধুদের কথাও খুব মনে পড়ে। সেই আড্ডা, সেই হাসি, সেই নির্ভেজাল সময়গুলো। এখানে বন্ধুত্বও যেন হিসেব করে হয়। সময়ের অভাব, ব্যস্ততা — সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্কগুলোও ফিকে হয়ে যায়।
রাতে যখন কাজ শেষে ঘরে ফিরি, তখন ঘরটা আরও বেশি খালি লাগে। চারপাশে সবকিছু আছে — বিছানা, টেবিল, আলো — কিন্তু মানুষ নেই। সেই শূন্যতা গিলে খেতে থাকে। টিভি চালাই, মোবাইল স্ক্রল করি — কিন্তু কিছুতেই মন বসে না। কারণ মনটা তো পড়ে আছে হাজার মাইল দূরে, আপন মানুষের কাছে।
মাঝে মাঝে খুব ভয় লাগে — এইভাবে কতদিন চলবে? এই একাকীত্ব, এই ক্লান্তি — সবকিছু সহ্য করার শক্তি কতদিন থাকবে? নিজেকে বোঝাই, "আর একটু, আর কিছুদিন" — কিন্তু সেই "কিছুদিন" কখন শেষ হবে, জানি না।
অনেক সময় নিজের কাছেই প্রশ্ন করি — আমি কি বদলে যাচ্ছি? এই কঠিন জীবন কি আমাকে কঠিন করে দিচ্ছে? আগে যেসব ছোট ছোট জিনিসে খুশি হতাম, এখন সেগুলো আর তেমন লাগে না। অনুভূতিগুলোও যেন ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।
তবুও স্বপ্ন দেখি। একটা ছোট ঘর, যেখানে সবাই একসাথে থাকবো। সকালে ঘুম ভাঙবে প্রিয় মুখগুলো দেখে, রাতে ঘুমাবো তাদের সান্নিধ্যে। কোনো দূরত্ব থাকবে না, কোনো কষ্ট থাকবে না। এই স্বপ্নটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করার শক্তি দেয়।
তবুও কিছু মুহূর্ত আসে, যখন হঠাৎ করে মন ভালো হয়ে যায়। হয়তো কোনো পরিচিত গান শুনে, হয়তো কোনো পুরোনো ছবি দেখে। তখন মনে হয়, এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি — এখনও ভেতরে কোথাও একটা আলো আছে, একটা আশা আছে।
এই আশাটাই আমাকে টেনে রাখে। প্রতিটা কষ্ট, প্রতিটা ত্যাগ — সবকিছুর পেছনে একটা কারণ আছে। সেই কারণটা হলো পরিবার, ভালোবাসা, ভবিষ্যৎ। তাদের জন্যই তো এই সব সহ্য করা, এই সব লড়াই করা।
কখনো কখনো খুব ইচ্ছে করে, কেউ এসে বলুক — "তুমি অনেক কিছু সহ্য করেছো, এবার একটু বিশ্রাম নাও।" কেউ যদি একটু বুঝতো, একটু পাশে দাঁড়াতো — তাহলে হয়তো এই পথটা একটু সহজ হতো।
প্রবাস জীবনটা আসলে এক ধরনের নীরব যুদ্ধ। এখানে কেউ তালি দেয় না, কেউ পুরস্কার দেয় না। শুধু নিজের সাথে নিজের লড়াই। প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত — নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।
শেষ পর্যন্ত একটা কথাই সত্য — প্রবাসীদের জীবনটা গল্পের মতো না, এটা বাস্তবের কঠিন এক অধ্যায়। এখানে প্রতিটা হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে কষ্ট, প্রতিটা সাফল্যের পেছনে থাকে ত্যাগ। আর এই ত্যাগের গল্প কেউ পুরোটা জানে না, কেউ পুরোটা বোঝে না।
শুধু একজন প্রবাসীই বুঝতে পারে — কতটা কষ্ট নিয়ে সে হাসে, কতটা ব্যথা নিয়ে সে বাঁচে। আর সেই বেঁচে থাকার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার সবচেয়ে বড় সাহস, সবচেয়ে বড় সংগ্রাম, সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।

Post a Comment

[blogger]

MKRdezign

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget