গর্ভাবস্থায় থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় -ডা. রেজাউল করিম কাজল

থ্যালাসেমিয়া একটি মারাত্মক জন্মগত রক্তরোগ। স্বামী-স্ত্রী এ রোগের বাহক হলে তাঁদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মাতে পারে।

সাধারণত এ রোগের বাহকদের কোনো লক্ষণ থাকে না। এরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। আক্রান্ত শিশুদের শরীরে রক্তের মূল্যবান উপাদান হিমোগ্লোবিন ঠিকমতো তৈরি হয় না। তখন অন্যের রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় এই শিশুদের। আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া এখন এক নীরব মহামারি, যাতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন থ্যালাসেমিয়া রোগের একমাত্র চিকিৎসা হলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই মাতৃজঠরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বাচ্চা থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত, না সুস্থ—তা নিশ্চিত হওয়া যায়।

রোগের বাহক কারা?

যে কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হতে পারে। যাদের বংশে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশু আছে তাদের ঝুঁকি বেশি।

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই জানা যায় কেউ থ্যালাসেমিয়া বাহক কি না। স্বামী ও স্ত্রী দুজনে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হলেই শুধু সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একজন বাহক ও অন্যজন সুস্থ—এমন দুজনের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হলে সন্তানদের কোনো সমস্যা হবে না। রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের বাঁচিয়ে রাখতে ও আনুষঙ্গিক খরচ বহন করতে গিয়ে আর্থিক দৈন্য ও মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন লাখো মা-বাবা।

গর্ভাবস্থায় পরীক্ষা

অ্যামনিওসেনটেসিস : এ পরীক্ষার সময় গর্ভস্থ শিশু একটা ব্যাগভর্তি তরল পদার্থ বা অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের মধ্যে অবস্থান করে। প্রথমে আলট্রাসনো মেশিনের সাহায্যে জরায়ুর ভেতরে বাচ্চা ও গর্ভফুলের অবস্থান নির্ণয় করা হয়। চলমান ছবি দেখে সূক্ষ্ম সুঁই বা নিডল মায়ের পেটের ওপর দিয়ে বাচ্চার চারপাশের তরল পদার্থের ব্যাগের ভেতরে ঢুকানো হয়। এরপর সিরিঞ্জের সাহায্যে ১৫ থেকে ২০ মিলি তরল পদার্থ টেনে আনা হয়।

করিওনিক ভিলাস স্যাম্পলিং : মায়ের গর্ভে বাচ্চা গর্ভফুলের মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে দরকারি পুষ্টি পেয়ে থাকে। আলট্রাসনো মেশিনের চলমান ছবি দেখে সুঁই বা নিডলের মাধ্যমে গর্ভফুল থেকে সামান্য কিছু কোষকলা (করিওনিক ভিলাস স্যাম্পলিং) নিয়ে আসা হয়। এই দুই পদ্ধতির মাধ্যমে সংগ্রহ করা তরল পদার্থ বা গর্ভফুলের কোষকলা ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয় ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে গর্ভের বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া রোগ আছে কি না তা নির্ণয়ের জন্য।

কখন এই পরীক্ষা?

গর্ভস্থ বাচ্চার বয়স যখন ১১ থেকে ১৪ সপ্তাহ, তখন করিওনিক ভিলাস স্যাম্পলিং ও যখন বাচ্চার বয়স ১৫ থেকে ১৮ সপ্তাহ, তখন অ্যামনিওসেনটেসিস পরীক্ষা করা হয়। এ সময় বাচ্চার আকার থাকে দেড়/দুই ইঞ্চির মতো।

আলট্রাসনোগ্রাফি করে গর্ভে বাচ্চা ও গর্ভফুলের অবস্থান, বাচ্চার বয়স, জরায়ুর গঠন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন কখন, কোন পরীক্ষাটি গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রযোজ্য।

ঝুঁকি ও সাবধানতা

এ পরীক্ষাগুলো করার কারণে ১০০ থেকে ২০০ জনের মধ্যে একজনের বাচ্চা নষ্ট হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি নির্ভর করে যিনি এ পরীক্ষাটি করবেন সেই চিকিৎসকের দক্ষতার ওপর। আবার খুবই বিরল ক্ষেত্রে যথেষ্ট নমুনা সংগ্রহ না হওয়ার কারণে পরীক্ষাটি আবার করার প্রয়োজন হতে পারে।

এ পরীক্ষাটি সম্পন্ন করতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে। এরপর ৩০ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে বাসায় গিয়ে দুই বা তিন দিন ভারী কাজ ও দূরের ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে হয়। তবে মাসিকের রাস্তায় কোনো ধরনের পানিজাতীয় স্রাব বা রক্ত গেলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসককে জানাতে হয়। সাধারণত এক সপ্তাহের ভেতরে পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

কতটা নির্ভরযোগ্য?

এ পরীক্ষার রিপোর্ট প্রায় শতভাগ নির্ভরযোগ্য। তবে মনে রাখতে হবে, যে রোগের কারণে পরীক্ষাটি করানো হচ্ছে, অর্থাৎ থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়ের জন্য করা হলে শুধু বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া রোগ আছে কি না তা বোঝা যাবে, অন্য রোগ নয়। ভিন্ন ভিন্ন রোগের জন্য পরীক্ষাও ভিন্ন।

পরীক্ষার রিপোর্টে বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া রোগ ধরা পড়লে গর্ভবতী মাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি গর্ভাবস্থা চালিয়ে যাবেন কি না। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত সন্তান সংসারে আনতে না চাইলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে চিকিৎসক মায়ের জন্য মঙ্গলজনক পরামর্শ দেবেন।

দরকার সচেতনতা

সচেতনতার অভাবে আমাদের দেশে দিন দিন থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি পুরুষ-মহিলা নিজের অজান্তে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। কিন্তু একটু সচেতন হলেই আমরা এ থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধ করতে পারি। সাইপ্রাস, বাহরাইন, ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশের মতো পৃথিবীর অনেক দেশে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর অথবা সন্তান নেওয়ার আগে স্বামী-স্ত্রীর থ্যালাসেমিয়া আছে কি না, তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক আইন করে থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণ করছে।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক

প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

-----------
আসাদ শাহীন
E-mail:shah33n@chef.net

Post a Comment

[blogger]

MKRdezign

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget