------------------------------
আর-রহমান? সুবহানাল্লহ! কী মুগ্ধতা আল্লহর এই নামে.....
আমরা যদি অর্থের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তবে আমরা রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেতে বাধ্য!
'আর-রহমান' অর্থ পরম করূণাময়! অর্থাৎ, মানব-দানব, ফেরেশতা, পশু-পাখি ইত্যাদি সকলের প্রতি যার রয়েছে অসীম করূনা, অবর্ণনীয় দয়া! মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম, ভাল বা মন্দ, নেককার-পরহেজগার কিংবা সবচেয়ে পাপী, নির্বিশেষে সকলকে খাদ্যপানীয়, আলোবাতাস সহ বেঁচে থাকার সব উপকরণ দিয়ে যিনি দয়া করছেন, তিনিই আর-রহমান!
আর এই রহমানের সিলেক্টিভ বান্দা কারা? কী বা তাদের পরিচয়? কাদের আমরা আদতেই আর-রহমানের বান্দা বলে আখ্যায়িত করতে পারি? স্বয়ং আর-রহমান, রাহমাতুল্লিল আ'লামিন তাঁর কালামুল্লাহতেই বলে দিয়েছেন তাদের পরিচয়....
وَ عِبَادُ الرَّحۡمٰنِ الَّذِیۡنَ یَمۡشُوۡنَ عَلَی الۡاَرۡضِ ہَوۡنًا وَّ اِذَا خَاطَبَہُمُ الۡجٰہِلُوۡنَ قَالُوۡا سَلٰمًا ﴿۶۳﴾
"আর রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে ‘সালাম’!"(১)
~আর-রহমানের বান্দারা হবে আদর্শ, শান্ত-নম্র, চুপচাপ, মিতভাষী, মানবিক! তারা হবে না অহংকারী কিংবা দাম্ভিক.... অথচ আমরা? ধনীর খাতায় নাম লেখালেই কী গরীমা আমাদের, দু-দন্ড ইলম-আমল হলে নিজেদের এমন জ্ঞানী ভাবতে শুরু করি, অন্য কাউকে চোখেই পড়ে না...ইলমহীন দের তুলনায় এরাই বরং অত্যাধিক ভয়ঙ্কর, বর্জনীয়! আর-রহমানের বান্দাদের প্রতিটা কথাই যেন হবে মুক্তোঝড়া, এরা কম কথা বললেও, এর ওজন হবে ভারী, এরা বেশি বেশি সালাম বিনিময় করবে, এরা শান্তিকামী! আমাদের তো অহংকার এতই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমরা সালাম দিতেও কার্পন্য করি, আমাদের সাহেবীপণায় বাধে! আল্লহ আমাদের ক্ষমা করুন....
وَ الَّذِیۡنَ یَبِیۡتُوۡنَ لِرَبِّہِمۡ سُجَّدًا وَّ قِیَامًا ﴿۶۴﴾
"আর যারা তাদের রবের জন্য সিজদারত ও দন্ডায়মান হয়ে রাত্রি যাপন করে।"(২)
~আর-রহমানের বান্দারা হবে অনুগত, এরা একান্তই রবের বাধ্য, সকল পরিস্থিতে-সকলাবস্থায় এরা রবের সন্তুষ্টি অর্জনে মেহনত করতে থাকে! শেষ রাতের সিজদায়, নিষ্পাপ শিশুর মত চোখের জলে এরা পাপ ঝড়ায়, নির্বাচিত হয় সেরাদের সেরায়... এরা সর্বদা জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে পানাহ চায়, দু'আ করে, জান্নাত লাভের ফিকিরে এরা সদা ব্যস্ত, এদের এই মেহনত এর বদৌলতে এরা একদিন সফল হবে, শত ঝড় ঝাপটা, ঈমানের পরীক্ষায় এরা জয়ী হয়ে জয় করে নেবে রবের সুসজ্জিত নিয়ামাহ-'জান্নাত'!
وَ الَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَنۡفَقُوۡا لَمۡ یُسۡرِفُوۡا وَ لَمۡ یَقۡتُرُوۡا وَ کَانَ بَیۡنَ ذٰلِکَ قَوَامًا ﴿۶۷﴾
"আর তারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।"(৩)
~প্রয়োজনের বেশি এরা অপচয় করে না, এরা সেই কঠিন দিবসের চিন্তায় মগ্ন থাকে, যেদিন পাই পাই করে সমস্ত নিয়ামাতের হিসাব দিতে হবে! বরং এরা মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারী, এরা কৃপণও নয়! এরা ব্যালেন্স মেইন্টেন করে জীবন অতিবাহিত করে! আর আমরা কত খাদ্য, কত নিয়ামাতের অপচয় করি তা হিসেবের উর্ধেব! অন্যের হক মেরে, জুলুম করে আমরা দিব্যি ভালো আছি.. আর-রহমান দয়া না করলে আমাদের পরিণতি হতো অকল্পনীয় ভয়াবহ!
وَ الَّذِیۡنَ لَا یَدۡعُوۡنَ مَعَ اللّٰہِ اِلٰـہًا اٰخَرَ وَ لَا یَقۡتُلُوۡنَ النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰہُ اِلَّا بِالۡحَقِّ وَ لَا یَزۡنُوۡنَ ۚ وَ مَنۡ یَّفۡعَلۡ ذٰلِکَ یَلۡقَ اَثَامًا ﴿ۙ۶۸﴾
"আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকে না এবং যারা আল্লাহ যে নাফসকে হত্যা করা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না। আর যারা ব্যভিচার করে না। আর যে তা করবে সে আযাবপ্রাপ্ত হবে।"(৪)
~এরা শুধু আল্লহর একত্ববাদে বিশ্বাসী! রবের সমকক্ষ হিসেবে অন্য কিছু তারা ভাবতেই পারেনা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এরা রিযিকের ভয়ে দুনিয়ার আলো দেখার আগেই নিজেদের ভ্রূণ সত্তাকে হত্যা করে না! অথচ আমাদের মত স্বার্থান্বেষী দুনিয়াপ্রেমীদের কাছে এই 'নষ্ট করে ফেলা' টার্মটি নিছক ছেলেখেলা! যিনা-ব্যভিচার আজ বিয়ে থেকেও সহজলভ্য, চারদিকে ফিতনা আর উলঙগতার ছড়াছড়ি! আর-রহমানের বান্দারা কই??
আজ আমরা চোখ থেকেও যে অন্ধ!
اِلَّا مَنۡ تَابَ وَ اٰمَنَ وَ عَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَاُولٰٓئِکَ یُبَدِّلُ اللّٰہُ سَیِّاٰتِہِمۡ حَسَنٰتٍ ؕ وَ کَانَ اللّٰہُ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ﴿۷۰﴾
"তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"(৫)
~তবে চাইলেই ফিরে আসা সম্ভব...আর-রহমানের বান্দারাই কেবল এই দু:সাহস করতে সক্ষম! সব কিছুকে পেছনে ঠেলে এরা তওবা করে রবের নিকট ফরিয়াদ করে ক্ষমা চাইতে জানে...পাপকে পূন্যে কনভার্ট করতে জানে! সুবহানআল্লাহ...
তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে আল্লহ সুবহানুওয়াতা'য়ালা বড় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু! এরা যেমন তাদের রবের উপর ধারনা পোষণ করেন, অনুরূপ রবও তেমনি এদের প্রতি অনুগ্রহ করেন!
এতেই শেষ নয়!
এরা রবের সমীপেই ফিরে আসে, সম্পূর্ণরূপে নিজেদের সপে দেয় রবের জিম্মায়!... সবর, ধৈর্য্য ও স'লাতের মাধ্যমে এরা সাহায্য প্রার্থনা করে, এদের জীবনটাই অনুকরণীয়, অনুসরণীয়!
দুনিয়াবী গাল-গল্পে মত্ত থাকার মতো বোকামী এরা করে না, অনর্থক কাজ-কর্মকে গুরুত্ব না দিয়ে এরা রবের নির্দেশিত 'সিরাতুল-মুস্তাকিমের' পথে হাঁটে, এরা প্রকৃত অর্থেই সম্মানিত, সমাদৃত!
وَ الَّذِیۡنَ اِذَا ذُکِّرُوۡا بِاٰیٰتِ رَبِّہِمۡ لَمۡ یَخِرُّوۡا عَلَیۡہَا صُمًّا وَّ عُمۡیَانًا ﴿۷۳﴾
"আর যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিলে অন্ধ ও বধিরদের মত পড়ে থাকে না।"(৬)
~রবের কালামের প্রতিটা বাণীকে এরা জীবন পরিচালনার পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে, নিবোর্ধের মতো রবের আদেশের বিরোধিতা করেনা, এজন্যই কিনা এরা আর-রহমানের বান্দা!
وَ الَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَا ہَبۡ لَنَا مِنۡ اَزۡوَاجِنَا وَ ذُرِّیّٰتِنَا قُرَّۃَ اَعۡیُنٍ وَّ اجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِیۡنَ اِمَامًا ﴿۷۴﴾
"আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন’।"(৭)
~এরা নিজেদের জন্যও রবের নিকট উত্তম কাউকে পাওয়ার আকুতি জানায় নিজের অর্ধাঙ-অর্ধাঙীনি হিসেবে, কুররাতু-আইয়্যুন পাওয়ার চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত থাকে, উদগ্রীব থাকেন! এরা নেক সন্তান প্রত্যাশী...এরা তাক্বওয়া অবলম্বনকারী, এরাই মুত্তাকি!
اُولٰٓئِکَ یُجۡزَوۡنَ الۡغُرۡفَۃَ بِمَا صَبَرُوۡا وَ یُلَقَّوۡنَ فِیۡہَا تَحِیَّۃً وَّ سَلٰمًا ﴿ۙ۷۵﴾
"তারাই, যাদেরকে [জান্নাতে] সুউচ্চ কক্ষ প্রতিদান হিসাবে দেয়া হবে যেহেতু তারা সবর করেছিল সেজন্য। আর তাদের সেখানে অভ্যর্থনা করা হবে অভিবাদন ও সালাম দ্বারা।"(৮)
~এদের জন্যই আর-রহমান পুরষ্কার হিসেবে সাজিয়ে রেখেছেন অপুরূপ সৌন্দর্যের আধার জান্নাত! দুনিয়ার চর্মচক্ষু দ্বারা পরিলক্ষন করা যাবেনা, অকল্পনীয়, অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের আবাসস্থল শুধুমাত্র আর-রহমানের প্রিয় বান্দাদের জন্যই...যারা সবর করেছিল, নিয়ামাতের শুকরিয়া আদায় করেছিল, যারা তাদের রবের প্রতি ছিল কৃতজ্ঞ, অনুগত! রবের ভালোবাসায় যারা নিজেদের আচ্ছাদন করে রেখেছিলো, রবের জন্যই যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিল!
সুবহানাল্লহ আল্লহু আকবার... আমরা আর-রহমানের পছন্দের তালিকায় থাকতে কতটা প্রস্তুতি নিচ্ছি? যিনি দিনকে দিন আমাদের পাপকে মুছে দিচ্ছেন, আমাদের পাহাড়সম গুনাহ'র থেকে দৃষ্টিপাত না করে আমাদের তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন, সেই মহামহিম, ক্ষমাশীল, দয়ালু, আর-রহমানের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কতখানি? নিজেদের আর-রহমানের বান্দা হিসেবে যোগ্য যদি নাই বা করতে পারি বা চেষ্টা ও না করি, হুতামা/হাবিয়া আমাদের জন্যই বরাদ্ধ!
_____________________________
Ref:
[১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ নং আয়াত যথাক্রমে সূরা ফুরকানের (২৫) আয়াত নং- ৬৩,৬৪, ৬৭, ৭০, ৭১, ৭৩, ৭৪, ৭৫ নং আয়াত!]
Post a Comment