দুনিয়ার যে বিষয়টা মানুষকে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেছে তা হল দ্বীন(ধর্ম) ও দুনিয়ার পৃথকীকরণ । অর্থাৎ দ্বীন ও দুনিয়ার কাজকে পৃথক পৃথক করে দেয়া হয়েছে । দ্বীন ও দুনিয়াকে দাড় করানো হয়েছে দুইটা পরস্পর বিরোধী অবস্থানে । একটাকে বিবেচনা করা হয়েছে অন্যটার প্রতিবন্ধক হিসেবে । যেখানে দ্বীন থাকবে সেখানেই কিছুতেই দুনিয়া থাকতে পারেনা । আবার যেখানে দুনিয়া থাকবে সেখানেও কোনভাবেই দ্বীন থাকতে পারেনা এরকম ধারণা আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত।
আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক আন্তরিকতা ও সৎ উদ্দেশ্যে দুনিয়ার যেকোন কার্যাবলী সম্পাদন করাই হল দ্বীন । সহজ কথায় আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক দুনিয়াদারীর নামই দ্বীন।
ইসলাম দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য করেনি । একজন মুসলিমের সব কাজই দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত।
দ্বীন ও দুনিয়া কখনোই সাংঘর্ষিক না বরং পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দুনিয়াবী বিষয়ের ক্ষেত্রে মূলনীতি হল, যতক্ষণ না তা দ্বীনের সাথে সংঘর্ষ না হবে, ততক্ষণ তা জায়েজ। তথা কুরআন ও সুন্নাহের কোন বিধানের লংঘণ না হবে, ততক্ষণ তা বৈধ হবে।
কেননা দুনিয়া হলো আখেরাতের কর্মক্ষেত্র এবং আখেরাতে পৌছার পথ।আমরা নিজেদের জীবনকে এমনভাবে সাজাবো যেনো দুনিয়া দিয়েই আমরা আখিরাতে সফলতা অর্জন করতে পারি।
ইসলামী চিন্তা চেতনায় দুনিয়ার আমল এবং আখেরাতের আমলের মধ্যে বিভাজন নেই। কারণ উভয় কর্মের লক্ষ্য অভিন্ন।
ইসলাম যে পরম লক্ষ্য স্থির করেছে তা হল মুসলমান দুনিয়াকে বশ করে নিজ ইচ্ছানুসারে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ব্যয় করবে। এমন যেন না হয় যে দুনিয়া
মুসলমানকে বশীভূত করে ফেলল; এমনভাবে যে, সে তাকে তার কর্তব্য ও দায়দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে রাখল।
ইসলাম কত যে সফলতা লাভ করেছে এমন কিছু মানুষ তৈরি করে, যারা দুনিয়ায় জীবন ধারণ করেছেন, নিজেদের সর্বশক্তি দ্বারা দুনিয়ার কাজকর্ম
করেছেন এবং দুনিয়াকে বশ করেছেন আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের ক্ষেত্রে অথচ দুনিয়ার উদ্দেশ্যে তারা জীবনকে যাপন করেননি।সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে বড় বড় বিত্তশালী লােক ছিলেন, যাদের প্রথম সারিতে ছিলেন আবু বকর, উসমান এবং আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ...!
কেমন ছিল তাদের দুনিয়া? তাদের দুনিয়া কি মুসলমানদের কল্যাণ ছাড়া অন্যকিছুতে ব্যয় হয়েছে?
হায়! আমরা যদি সব বিষয়কে যথােপযুক্ত মর্যাদা দিতাম এবং আমরা আমাদের ইসলামকে সঠিকভাবে বুঝতাম!
তাহলে আমরা যদি,সাহাবাদের জীবনী দেখি তাহলে আমাদের কাছে জব ,ক্যারিয়ার ও দ্বীন এর সম্পর্ক পরিষ্কার হয়ে যায়।
*তারা ব্যাবসা করতেন ইসলামের সীমারেখাকে মেনে চলেই,হালাল পন্থায় জীবিকা নির্বাহ করতেন, সাধ্যমতো দান করতেন।
*ব্যাবসা,জীবিকার তাগিদ,ক্যারিয়ারের চিন্তা তাদেরকে কখনোই দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি।বরং তারা ক্যারিয়ার পেশা ও দ্বীনের মধ্যে ভারসাম্য করেছেন।
*অতিরিক্ত সম্পদের লোভ তাদেরকে কৃপণ বানাতে পারেনি,সাহাবীগণ রাঃ ব্যবসা করতেন কিন্তু তাদের দুনিয়াবি লোভ স্পর্শ করতো না। হালাল-হারামের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন সবসময়, সন্দেহজনক যেকোনো কিছু থেকে দূরে থাকা তাদের (রাঃ) সুন্নাহ ছিলো।
*তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করতেন কিন্তু আমলে কোনো কমজোরি হতো না। সালাত, সিয়াম, কিয়াম, ক্বি-তাল করার পাশাপাশিই ব্যবসা করতেন।ব্যাবসায় থেকে উপার্জিত বেশিরভাগ অর্থই তারা আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিতেন।
চলুন একটা পরিসংখ্যান দেখা যাক :
১.সাহাবী আব্দুর রহমান বিন আউফ যখন মারা যান তখন তার সম্পদের পরিমাণ ছিলো তৎকালীন স্বর্ণমুদ্রায় ৩.১ মিলিয়ন দিনার।
একটি ইসলামিক দিনার =৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ।
ওনার পুরো সম্পদকে যদি USD তে হিসাব করা হয় তাহলে তা দাড়ায় :
৪.২৫×৩১০৩০০০০০০×৬০=৭৯১ বিলিয়ন USD।বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিটির চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ধনী ছিলেন আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা)।
ইবনে হাজার (রহ.) আল-ইসাবা গ্রন্থে উল্লেখ করেন, আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) মোট ৩০ হাজার দাস মুক্ত করেছেন। আল্লাহর রাস্তায় ৪০ হাজার দিনার, ৫০০ ঘোড়া এবং ৫০০ বাহন দান করেছেন। (উসদুল গাবাহ)
-বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় তিনি আল্লাহর রাস্তায় ৭০০ টি উঠ ও দান করেছিলেন।
২.তাবুক যুদ্ধে উসমান গণী (রাঃ) পরপর পাঁচবারে হাওদাসহ ৯০০ উট, গদি ও পালান সহ ১০০ ঘোড়া, প্রায় সাড়ে ৫ কেজি ওযনের কাছাকাছি ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা, প্রায় ২৯ কেজি ওযনের কাছাকাছি ২০০ উক্বিয়া রৌপ্য মুদ্রা দান করেন। স্বর্ণমুদ্রাগুলি যখন রসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোলের উপরে তিনি ঢেলে দেন, তখন রসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেগুলি উল্টে-পাল্টে বলতে থাকেন, مَا ضَرَّ عُثْمَانَ مَا فَعَلَ بَعْدَ الْيَوْمِ ‘আজকের দিনের পর কোন আমলই উসমানের কোন ক্ষতি করবে না’। (তিরমিজি)
এই বিপুল দানের জন্য তিনি مجهز جيش العسرة অর্থাৎ ‘তাবুক যুদ্ধের রসদ যোগানদাতা’ খেতাব প্রাপ্ত হন (ইবনু খালদূন)।
একটি উটের দাম যদি গড়ে ১০ লাখ ধরি ৯০০ উটের দাম ৯০ কোটি টাকা, ১০০ টি আরব ঘোড়ার দাম গড়ে ৫ লাখ করে ধরলে ৫ কোটি টাকা, সাড়ে ৫ কেজি স্বর্ণমুদ্রার দাম প্রায় ৩০ কোটি টাকা, ২৯ কেজি রূপার দাম প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
মোট প্রায় ১৬০ কোটি টাকা! (এখানে আমি হিসাব করার সময় দাম অনেক কম ধরেছি। কারণ এত বেশি হিসাব করতে পারছি না)
তাহলে উসমান রাঃ কেবল তাবুকের যুদ্ধে দানই করেছিলেন ১৬০ কোটি টাকা!
৩.মুসআব ইবনে উমায়র (রা.) ছিলেন মক্কার সম্ভ্রান্ত বংশের লোক ,তখনকার সময়ের সবচেয়ে মূল্যবান জামাগুলো সবচেয়ে মূল্যবান সুগন্ধি তিনিই ব্যবহার করতেন।কিন্তু যখনই তার পরিবার তার ইসলাম পালনে বাধা দিলো তিনি সবকিছুকেই ত্যাগ করলেন কিন্তু দ্বীনকে আকড়ে ধরে রেখেছিলেন মৃত্যু পর্যন্ত।মক্কায় রাজপুত্রের মতো জীবনযাপন করা সেই মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.) এর মৃত্যুর সময় কবরে দাফন করার জন্য মাত্র কয়েক টুকরো কাপড় ছিলো তাও পুরো শরীর ঢাকা সম্ভব হয়নি।তারা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করতেন ,ব্যাবসা বাণিজ্য,সামাজিক কাজ,আত্নীয়তার সম্পর্ক রক্ষা।কিন্তু যখনই কোনো কিছু দ্বীনের সাথে সাংঘর্ষিক হতো তখন তারা দ্বীনকেই সবার আগে প্রাধান্য দিতেন।তারা কখনোই দ্বীনকে অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে দেখেননি তাদের ক্যারিয়ারের বাধা হিসেবে দেখেন নি,বরং দ্বীনের কাজই ছিলো তাদের ক্যারিয়ার আর বাকি সবকিছু ছিলো এডিশনাল।
কিন্তু আমাদের কাছে তা একদমই উল্টো।আমরা আমাদের ক্যারিয়ারের জন্য এতোটাই ব্যস্ত ,দ্বীনের কাজে সময় দেয়ার ফুসরত আমাদের হয়না।তাছাড়া,এখন আমরা লেখাপড়া করি কি জন্য? বিসিএস ক্যাডার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। ভালো ক্যারিয়ার গড়া। টাকা পয়সা ইনকাম করা। এইত আমাদের লেখাপড়ার মূল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যের সাথে দ্বীনের নূন্যতম সংশ্লিষ্টতা থাকেনা বললেই চলে।যার ফলে আমরা হয়ে যাই দুনিয়া লোভী,এবং দুনিয়া আমাদের এতোটাই গ্রাস করে আমরা এর বলয় থেকে কখনো বেরিয়ে আসতে পারিনা।
-আমাদের ক্যারিয়ার ম্যাপিং এর ভিত্তি হবে দ্বীন। এর ভিত্তিতেই আমরা আমাদের জীবনকে সাজাবো।
-আমরা ক্যারিয়ার ও জবে অগ্রগামী হবো, তবে কখনোই তা যেনো আমাদের দুনিয়ার মোহে না ফেলে,বরং আমাদের এই অগ্রগতি যেনো দ্বীনের কাজেই ব্যয় হয়,এবং শরীয়াহ এর মানদন্ডের ভিতরেই হয়।
-আমরা আমাদের ক্যারিয়ার হিসেবে বা জব হিসেবে এমন কিছুকে বাছাই করবো না যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।
-আমাদের ব্যাবসা,অর্থনৈতিক লেনদেন,চাকুরী,সামাজিকতা ,আচার আচরণ ,পারস্পরিক সম্পর্ক, পারিবারিক কাজ সবকিছুতেই দ্বীনকে প্রাধান্য দিতে হবে কোনো কিছুই দ্বীনের বাইরে নয়,অর্থাৎ আমাদের দুনিয়াদারী হতে হবে শরীয়াহ এর নিয়ম নিতীর মধ্যেই।
-দ্বীনদারিতা মানে বৈরাগ্যবাদিতা নয়।সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলা নয়,বরং সবকিছুর মধ্যে দ্বীনকে আকড়ে ধরাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য ।
-আমরা দুনিয়াবী প্রয়োজনীয় কাজে সময় দিবো কিন্তু যখনই দ্বীনের প্রসঙ্গ আসবে তখনই দুনিয়ার উপরে দ্বীনকে প্রাধান্য দিবো।এটাই নিয়েই মুমিনের সবচেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।যদি সাহাবাদের জীবনী দেখি তাহলে আমরা দেখতে পাই যখন ইসলামের কোনো কাজের ডাক পড়তো তখন তারা তাদের সবকিছুকে তুচ্ছ করে দিয়ে ছুটে আসতেন।দ্বীনের কাজে তারা এতোটা অটল ছিলেন,দুনিয়ায় তাদের মোহে ফেলতে পারেনি।
সবকথার মূলকথা :আমাদের ক্যারিয়ারই তো হলো আমাদের দ্বীন।সবকিছুতো এটাকে ভিত্তি করেই সাজাবো,এবং যা দ্বীনের সাথে সাংঘর্ষিক তা বাদ দিবো।আল্লাহ তাওফীক দাতা।
Post a Comment